রবিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৮

বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্বঃ ইতিহাসের ইঙ্গিত

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের বৈশাখী মেলাটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর বৃহত্তম বাঙালির মিলনমেলা। প্রতি বছরই মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকি। এই বর্ষবরণের মেলাটি হয় অলিম্পিক পার্কের বিশাল এএনজেড স্টেডিয়ামে। এ উপলক্ষে শুধু সিডনি-ক্যানবেরাই নয়, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকি বহির্দেশ থেকেও বাঙলীরা আসেন সিডনিতে। প্রবাসে দুই বাঙলার মানুষ মিলে মিশে আনন্দে মেতে উঠেন। এতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ থেকে আসেন নামি দামি শিল্পীরা। লোকে টিকেট কেটে মেলা দেখে। গোটা স্টেডিয়াম জুড়ে বিভিন্ন পণ্যের স্টল বসে। নানা রকমের সুস্বাদু খাবার, বই, পোশাক থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠানের স্টল থাকে মেলা প্রাঙ্গণে। আমার প্রিয় স্টলগুলি হল বইয়ের। অ্যামাজন কিন্ডেলের ই-বুকের তালিকায় বাংলা বইগুলি এখনো যায়গা করে নিতে পারেনি। তাই বাংলা বইয়ের জন্য ছাপা বই-ই ভরসা। এবার মানে ২০১৮-র মেলায় অনেক গুলো বইয়ের মাঝে নজরে পড়ল নীহাররঞ্জন রায়ের 'বাঙালির ইতিহাস, আদি পর্ব'। মনে পড়ল নিজের ইতিহাস সম্বন্ধে বাঙালির অনুসন্ধিৎসাহীনতা দেখে,  নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিকে বলেছিলেন আত্মবিস্মৃত জাতি। যাপিত জীবনের নির্দিষ্ট কালখণ্ডের মধ্যে বাঙালি বেঁচে থাকে, তারপর একদিন টুপ করে মরে যায় । বইটি কিনতে গিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম নীরদ সি চৌধুরীর কথা সত্যি প্রমাণ করে অন্য অনেক গুলো রেফারেন্স বইয়ের মাঝে এটিও হয়ত পরে রইবে আমার বইয়ের তাকে। কিন্তু তা হলো না। একবার হাতে নেয়ার পর আর তুলে রাখা গেলো না বইটি। 'কোথা হইতে আসিয়াছ, নদি?’ এই প্রশ্নের ন্যায় আমারও জানতে ইচ্ছে হলো বাঙালির হাজার বছরের পথপরিক্রমার ইতিহাস। 

নাম থেকেই আঁচ  করতে পারি এটি বাঙলার রাজা-মহারাজাদের ইতিহাস নয়। বাঙালির ইতিহাস। বাঙালি নরগোষ্ঠীর ইতিহাস। এই ইতিহাস জুড়ে ছড়িয়ে আছে অনেক অনেক মণিমুক্তা। লেখক আমাদের শিহরিত করেন, বাঙালি জীবনের ছোটখাট রীতি-নীতি, রেওয়াজ, উৎসব-পার্বণের সাথে পরিচয় করিয়ে  দিয়ে,  যা হাজার বছর পরও প্রায় অপরিবর্তিত হয়ে রয়ে গেছে আমাদের সমকালীন জীবনে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের সাথে তাই একমত না হয়ে পারি না। তিনি বলছেন, 'ইতিহাসের কথা ছাড়িয়া, ভাষা ও সাহিত্যের দিক হইতেও সমগ্র বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে ইহা একটি অনন্যপূর্ব গ্রন্থ'। আর একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক প্রবোধচন্দ্রের মতে,  'এটি বাংলার প্রাচিন ইতিবৃত্ত বিষয়ক শেষ বই এবং বাংলার ইতিবৃত্ত সাধনার চরম পরিণতি ঘটেছে এটিতেই'। নীহাররঞ্জন রায় নিজেই  স্বীকার করছেন এই বইয়ের তথ্য ও উপাদানে নূতন কিছু নেই।  তিনি নিজে এর কিছুই আবিষ্কার করেননি। শুধু প্রাচীন বাঙলার ও বাঙালির ইতিহাস এক নূতন কার্যকারণসম্বন্ধগত যুক্তিপরস্পরায়, এক নূতন দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই বইটি হয়ে উঠেছে সুখপাঠ্য।

 বইটির সময়কাল মুসলমান দ্বারা বাঙলা বিজয় পর্যন্ত। এই সময়কালের মধ্যে প্রাচীন বাঙলার ভৌগলিক সীমা, ধন-সম্পত্তি, শস্য উৎপাদন পদ্ধতি, ভূমি, বর্ণ, শ্রেণী, রাষ্ট্র, রাজবৃত্ত, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্পকলা সহ বাঙালি জীবনের প্রায় সব কটি বিষয় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন অসাধারণ পাণ্ডিত্যে।

শেষ অধ্যায়ে এসে নীহাররঞ্জন বলেন, 'এই সুবিস্তৃত তথ্যবিবৃতি ও আলোচনার ভিতর হইতে ইতিহাসের কোন কোন ধারা সরু মোটা রেখায় সুস্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে, নিরবচ্ছিন্ন সমগ্র প্রবাহটির কোথায় কোন বাঁকে দৃষ্টিগোচর হইতেছে, এই সুবিস্তৃত কালখণ্ড পরবর্তী কালখণ্ডের জন্য কী কী বস্তু উত্তরাধিকার স্বরূপ রাখিয়া যাইতেছে, ভবিষ্যতের কোন নির্দেশ দিয়া যাইতেছে, এক কথায় এই সুবৃহৎ গ্রন্থ ভেদ করিয়া ইতিহাসের কোন ইঙ্গিত ফুটিয়া উঠিতেছে, গ্ৰন্থশেষে একটি অধ্যায়ে তাহার আলোচনা উপস্থিত করা হয়তো অসঙ্গত নয়’। মেধাবী হাতে তারপর তিনি লিখে যান বাঙালির ইতিহাসের সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহটির সুস্পষ্ট ইঙ্গিতের কথা। যা এই নরগোষ্ঠীর গর্বিত উত্তরাধিকার। কি সেই উত্তরাধিকার? এই অধিকার বাঙলার পলি মাটির মতই কোমল প্ৰাণধর্ম ও হৃদয়াবেগের উত্তরাধিকার। একই সাথে প্রতিবাদ প্রতিরোধেরও। বাঙালির সাথে মধ্যগাঙ্গেয় সনাতনত্বের বিরোধ দেখিয়ে দিয়ে লেখক বলেন, 'শাস্ত্রচর্চা ও জ্ঞানচর্চায় বুদ্ধি ও যুক্তি অপেক্ষা প্ৰাণধর্ম ও হৃদয়াবেগের প্রাধান্য; বাঙলার পরিবার ও সমাজবন্ধন প্রভৃতি সমস্তই আৰ্যমানসের দিক হইতে বৈপ্লবিক ও সনাতনত্বের বিরোধী। দুঃসাহসী সমন্বয়, স্বাঙ্গীকরণ ও সমীকরণ যেন বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; সনাতনত্বের প্রতি একটা বিরাগ যেন বাঙলার ঐতিহ্য ধারায়। ইহার মূল প্রধানত বাঙালির জনগত ইতিহাসে, কিছুটা তাহার ভৌগোলিক পরিবেশে, তাহার নদনদীর ভাঙা গড়ায়, কিছুটা ইতিহাসের আবর্তন-বিবর্তনের মধ্যে।' 

বাংলাভাষী জনসাধারণের হৃদয়াবেগ ও ইন্দ্রিয়ালুতার কথা উল্লেখ করে লিখেন, 'প্রাচীন বাঙালির হৃদয়াবেগ ও ইন্দ্রিয়ালুতার ইঙ্গিত তাহার প্রতিমা-শিল্পে এবং দেব-দেবীর রূপ-কল্পনায় ধরা পড়িয়াছে'। তিনি আরও বলেন, 'এই হৃদয়াবেগ ও ইন্দ্রিয়ালুতা যে বহুলাংশে আদিম নরগোষ্ঠীর দান, তাহা আজিকার সাঁওতাল, শবর প্রভৃতির জীবনযাত্রা, পূজানুষ্ঠান, সামাজিক আচার, স্বপ্ন-কল্পনা, ভয়-ভাবনার দিকে তাকাইলে আর সন্দেহ থাকে না।'

বাঙালি জাতি বরাবরই সনাতন আর্যধর্মের বিপরীতে গিয়ে নিজের হৃদয়াবেগকে সবার উপরে স্থান করে দিয়েছে। নীহাররঞ্জন রায়ের কথায়, 'আর্য-ব্রাহ্মণ্য এবং বৌদ্ধ ও জৈন সাধনাদর্শে কিন্তু এ ঐকান্তিক হৃদয়াবেগ ও ইন্দ্রিয়ালুতার এতোটা স্থান নাই। সেখানে ইন্দ্রিয়ভাবনা বস্তু-সম্পর্ক-বিচ্যুত; ভক্তি, জ্ঞানানুরাগ ও হৃদয়াবেগ বুদ্ধির অধীন। বস্তুত বাঙালির অধ্যাত্মসাধনার তীব্র আবেগ ও প্রাণবন্ত গতি সনাতন আর্যধর্মে অনুপস্থিত।'

দেবতাদের সাথে বাঙালির সম্পর্ক নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ, 'মধ্যযুগে দেখিতেছি, দেবই হউন আর দেবীই হউন, বাঙালি যথাসম্ভব চেষ্টা করিয়াছে তাহাদের মর্ত্যরে ধুলায় নামাইয়া পরিবার-বন্ধনের মাধ্যেমে বাঁধিতে এবং ইহগত সংসার-কল্পনার মধ্যে জড়াইতে, হৃদয়াবেগের মধ্যে তাহাদের পাইতে ও ভোগ করিতে, দূরে রাখিয়া শুধু পূজা নিবেদন করিতে নয়।'

আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতির নিজেদের আয়ুষ্কালের বাইরে গিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বর্তমানকে দেখার মাঝে আশার আলো দেখতে পাই। 'আপনারে চিনতে পারলে যাবে অচেনারে চেনা'। প্রবাসে বসে বাঙালির ইতিহাস পড়তে পড়তে এই ধারনাটি আরও বেশি পোক্ত হয়।

শুক্রবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

পিমুলওয়ে



দক্ষিণ গোলার্ধের সুন্দরি সিডনি শহরের যে সার্বাবে আমার বাড়ি সেখানে এক সময়ে দাপিয়ে বেড়াত আদিবাসী মানুষেরা। যাদেরকে অ্যাবরিজিনাল বলা হয়। বর্তমান সময়ে এই এলাকাটা মূলত অভিবাসী ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কান অধ্যুষিত। আদিবাসী কোথাও নজরে পরে না। কিন্তু এই এলাকার নামকরণে আদিবাসীদের ছোঁয়া রয়ে গেছে আজও। এই যেমন গিরাউইন, তুঙ্গাবি, উলুমুলু বা পিমুলুওয়ে সার্বাব। অ্যাবরিজিনাল ভাষায় ’গিরাউইন' মানে ফুলেদের দেশ, তুঙ্গাবি মানে জলের ধারের দেশ, উলুমুলু মানে ছোট্ট কালো ক্যাঙ্গারুর দেশ, ‘পিমুলুওয়ে' মানে 'পৃথিবী’। এই নান্দনিক নামগুলো শুনেই কৌতূহল হয় আদিবাসীদের জীবন ও ইতিহাস সম্বন্ধে।

২৬শে জানুয়ারি, ১৭৮৮ তে ইংরেজ ক্যাপ্টেন জেমস কুকের প্রথম নৌবহর নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে পদার্পণ করার মুহূর্তকে বলা যায় দেশটিতে পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতার সূচনাকাল। তার আগে এখানে ছিল আনুমানিক ৫০০০০০ থেকে ৭৫০০০০ আদিবাসী। প্রায় ২৫০টি স্বতন্ত্র ভাষা নিয়ে তাদের ছিল স্বতন্ত্র আচার-আচরণ ও ভূখণ্ড। প্রায় চল্লিশ হাজার বছর ধরে আদিবাসীদের পদচারণায় গড়ে উঠেছিল যে বিচিত্র স্বতন্ত্র সংস্কৃতি তা কেপ্টেন কুক ও গভর্নর আর্থার ফিলিপের 'terra nullius' নীতিতে, যার অর্থ দাঁড়ায় 'land belonging to no-one', ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে, প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। তাদের আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়িত করতে সেখানে অভিবাসিত করা হয় ব্রিটিশ অপরাধীদের। কেঁড়ে নেয়া হয় আদিবাসীদের ভূমি। গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের। নূতন অভিবাসীদের সাথে করে যে রোগগুলো নিয়ে এসেছিল শুধু তাতে করেই মারা যায় প্রায় ৬০ শতাংশ আদিবাসী। বর্তমানে তারা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার ২.৪% মাত্র। নিজ ভূমে এখন তারা পরবাসী। দেশটির সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। কেপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা দেয়ার সাথে সাথেই আদিবাসীরা গর্জে উঠেছিল ‘ওয়ারা, ওয়ারা, ওয়ারা’ বা ‘চলে যাও চলে যাও’ বলে। যদিও ২৬শে জানুয়ারী দিনটি এখানে ‘অস্ট্রেলিয়া দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু এই দিনটি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা এখনো আগ্রাসন দিবস হিসেবেই গণ্য করে। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তার পুরোভাগে ছিল এক অসীম সাহসী কিংবদন্তী পুরুষ পিমুলওয়ে। যার নামেই সিডনির পিমুলওয়ে সার্বাব এবং রেডফার্নের পিমুলওয়ে পার্ক।

পিমুলওয়ে জন্মে  ১৭৫০ সালে বর্তমান নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের জর্জ নদীর উত্তরে বিদিজগাল জনগোষ্ঠীর এক পরিবারে। যারা ইওরা জাতি হিসেবে পরিচিত। ইওরা সমাজের মূল ভিত্তি বংশ পরম্পরা। এরা সম মাত্রিক ও অজড়বাদী। পূর্বপুরুষের সাথে রয়েছে এদের গভীর বন্ধন। ইওরাদের বাস সমুদ্র উপকূল অঞ্চলে এবং সামুদ্রিক মৎস্য ও অন্যান্য জীবজন্তু শিকার করে এঁদের জীবিকা নির্বাহ।

জন্ম থেকেই পিমুলওয়ের চোখে ছিল সমস্যা কিন্তু তা সত্ত্বেও এই মানুষটি তার প্রাত্যহিক কাজে প্রমাণ করছিল সে অন্য অনেক থেকে অনেকই এগিয়ে। ইওরা মানুষেরা তাকে জানতো 'বুদ্ধিমান মানুষ' হিসেবে। তার এলাকা তুঙ্গাবি ও পাররামাট্টার মানুষরা এই অঞ্চলের রীতিনীতি লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান দিত সে। সবাই বিশ্বাস করত পিমুলুওয়ের রয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা। অনেক কিংবদন্তী গল্প আছে তাকে নিয়ে। একবার নাকি সে কাক হয়ে উড়ে গিয়েছিল ব্রিটিশদের লোকাপ থেকে। তাই সে স্থানীয়দের মাঝে ’বুটুওয়াগন’ বা কাক হিসেবেও পরিচিত।

পিমুলুওয়ে শুধুমাত্র তার নিজের ইওরা ট্রাইব-ই নয় আশেপাশের ধারাগ, থারাওয়াল ট্রাইবকেও তার নেতৃত্বে সঙ্ঘবদ্ধ করতে পেরেছিল শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে। অনেকটা গেরিলা কায়দায় পিমুলয়াই  শ্বেতাংগ সাহেবদের ফসল ও গবাদি-পশুতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যেত। ছয় ফুট উচ্চতার পিমুলুওয়ের ছিল অসীম সাহস আর বল্লমের অবার্থ নিশানা। তার যুদ্ধ ছিল প্রতিটি পশ্চিমা অভিবাসিতদের বিরুদ্ধে যারা দখল করেছিল তাদের জল ও মাটি। প্রায় ১২ বছর ধরে চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে ইংরেজদের অবস্থা নাজেহাল করে তুলেছিল সে।

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০১৫

একগুচ্ছ কবিতা

নীরবতা


সাদা কাগজের নীরবতায় লুকিয়ে থাকে যে বেদনা তাকে উপমা হিসেবে দাঁড় করিয়ে কাব্য লেখার ইচ্ছে আমার নেই। ইসলামোফোবিয়া-সেফ্রনাইজেশন নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা কিংবা সমালোচনায় নেই কোন উৎসাহ। নিশ্চিত মৃত্যু যেনেও কালো কালো মানুষেরা কেন রিকেটি নৌকো নিয়ে পাড়ি দেয় ম্যাডিটেরেনিয়ানের জলে তা নিয়ে ভাবুক অন্য কেউ। সীমান্তের কাঁটা তারে গুলি খেয়ে পরে ছিল যে ফেলানি তাঁর অভিশাপে ও আমার কিছু আসে যায় না। আমি বরং আমার কথা বলি। ডিনার টেবিলে রাখা আমার চিকেন বিরিয়ানির সুগন্ধ তোমাকে ক্ষুধার্ত করুক। এসো,তোমাকে দেখাই আমার অবকাশ যাপনের ওপেন অ্যালবাম। তোমার ক্ষুধার্ত আর প্রতিহিংসায় নীল হয়ে যাওয়া মুখচ্ছবি তখন আমার কাছে কবিতা হয়ে উঠবে। সাদা কাগজের নীরবতায় লুকিয়ে থাকা বেদনার মতো কবিতা।

জুন ২৭, ২০১৫
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

ইচ্ছে ডানা


‘*যে উড়ে চলেছে, সে কেউ নয়, কিছু নয় - সে কেবল কবি’- জয় গোস্বামী*

ইচ্ছে করলেই লেখা যেত,
একটি মন ভাল করা প্রেমের কবিতা।
অলঙ্কারে-অনুপ্রাসে, নরম মোমের আলোয়,
লেখা যেত একটি রোমান্টিক
ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের মনোরম বিবরণ।

ইচ্ছে করলেই ঝিলের মতো শান্ত বালিকা,
সকল নীরবতার অবসান ঘটিয়ে,
বৃষ্টি ভেজা শ্রাবণ দিনের রঙধনু হয়ে,
ঝরণার মতো হেসে যেতে পারত অকারণে।

ইচ্ছে করলেই বাঁধনহারা এক ঝাঁক শব্দ,
সাইকেল বালক হয়ে চলে যেতে পারত,
কলেজ রোডের ঐ বাড়িটার ধারে,
যার আকর্ষণ ছিল চুম্বকের চেয়েও বেশী।

কৈশোর ও যৌবনের সীমাহীন দারিদ্রতায়,
ভাড়া বাড়ীর জানলায় একা  দাড়িয়ে,
সাবলীল চাঁদের জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে,
আমাদের ইচ্ছে গুলো কখনও উড়তে শেখেনি।

আমরা কেউ কবি হতে পারিনি।

প্রজন্ম


হাটি হাটি পা পা করছে যে প্রজন্ম
তার কানে কানে বলেছি গতকাল,

আমাদের কোন মানচিত্র নেই,
আমাদের কোন পতাকা নেই,
আমাদের কোন নেতা নেই,

ছায়াপথের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি
আমাদের কেউ নয়।


তাকে আরও বলেছি,
আমাদের গোয়াল ভরা গরু ছিল,
ছিল দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ,
ছিল সোনালী অতীত।

খুঁজে দেখো ধামাইলের সুরে,
রাধারমণের মন মুনিয়ায়।

গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের বিস্তীর্ণতায়
খুঁজে দেখো,
আমাদের হারিয়ে যাওয়া পদচিহ্ন,

যদি ইচ্ছে হয়।

১৯শে জুলাই, ২০১১
বেঙ্গালোর, কর্ণাটক


 শব্দগুচ্ছ


শব্দগুচ্ছ লিখে রাখো
যৌবন…উলটো হাওয়া…অস্থির সময়

রৌদ্রজ্জ্বল পাণ্ডুলিপি ম্যাচো হয়ে ওঠো
সঙ্গম এর উচ্চ শিখরে

স্খলনের শূন্যতা নয়, লিখে রাখো
অষ্টের স্বাদ…মাতাল নিঃশ্বাস…নখের আঁচড়


শ্রাবণ


শ্রাবণ আসে শ্রাবণ যায়,
ফ্ল্যাটবাড়ীর এই বারান্দায়।

কদমফুলের পাইনা দেখা,
বিশাল ঘরে থাকি একা ।

বৃষ্টি ঝরে অন্ধকারে,
মন চলে যায় বরাক পারে।

ডিস টিভিতে সবই আসে,
তবু তোমায় পাইনা কাছে ।

দূরে থেকেও পাশে থাকি ,
কুটুর কুটুর কিবোর্ড টিপি ।

১৬ই জুলাই, ২০১১
বেঙ্গালোর, কর্ণাটক


 স্লেট-পেন্সিল


বহতা নদীর গ্রন্থনায়,
পাগলা গাজীর
স্কুলটা ছিল দেয়াল বিহীন,
তারপর অনেক গুলো
দুরগামী ট্রেন-বাস-উরুজাহাজ পেরিয়ে
অস্ফুট ইসারায় আজও ডেকে যায়
প্রথম ভাগের স্লেট-পেন্সিল।


মিত্রা দিদি


‘*ঝাউ গাছের পাতা, তোমার মিত্রা দিদি ভালতো শিলচরে?’ - জয় গোস্বামী*


মিত্রা দিদি, তোমাকে নিয়ে কাব্য

লেখেনি কোন পুরুষ কোন দিন।

গলির মোড়ে বাজেনি সম্মিলিত

শীৎকার,  বখাটে ছেলেদের।


তোমাকে দেখতে আসেনি পাত্রপক্ষ,

এসেছিল শুধু মেপে নিতে,

তোমার বুক, চুল, নিতম্ব

যাবতীয় সব শারীরিক।


কত বার গেছ তুমি কামরূপ-কামাখ্যা ?

কত বার ছুঁয়েছ তুমি কাম পীঠে সিঁদুর ?

কত বার পালটেছ জ্যোতিষী তুমি ?

কত বার করিয়েছ জাদু-টোনা ?


কত যুগ  উপবাসী তুমি ঢেলেছ  দুগ্ধ,

সুগঠিত  শিবলিঙ্গে ?



সে খবর জানে শুধু,

একলা রাতের পাশ বালিশ।

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০১১

শনিবার, ২৭ জুন, ২০১৫

সাদা কাগজের নীরবতা

সাদা কাগজের নীরবতায় লুকিয়ে থাকে যে বেদনা তাকে উপমা হিসেবে দাঁড় করিয়ে কাব্য লেখার ইচ্ছে আমার নেই। ইসলামোফোবিয়া-সেফ্রনাইজেশন নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা কিংবা সমালোচনায় নেই কোন উৎসাহ। নিশ্চিত মৃত্যু যেনেও কালো কালো মানুষেরা কেন রিকেটি নৌকো নিয়ে পাড়ি দেয় ম্যাডিটেরিয়ানের জলে তা নিয়ে ভাবুক অন্য কেউ। সীমান্তের কাঁটাতারে গুলি খেয়ে পরে ছিল যে ফেলানি তাঁর অভিশাপে ও আমার কিছু আসে যায় না। আমি বরং আমার কথা বলি। ডিনার টেবিলে রাখা আমার চিকেন বিরিয়ানির সুগন্ধ তোমাকে ক্ষুধার্ত করুক। এসো , তোমাকে দেখাই আমার দামি ক্যামেরাবন্দী অবকাশ যাপনের ওপেন অ্যালবাম। তোমার ক্ষুধার্ত আর প্রতিহিংসায় নীল হয়ে যাওয়া মুখচ্ছবি তখন আমার কাছে কবিতা হয়ে উঠবে। সাদা কাগজের নীরবতায় লুকিয়ে থাকা বেদনার মতো কবিতা।

শনিবার, ২৯ জুন, ২০১৩

ফেবু স্ট্যাটাস #২

এখানে ও বৃষ্টি হয়। আকাশ কাঁদে। শুধু শৈশবের সেই টিনের চালে, রিম-ঝিম বৃষ্টি পড়ার শব্দগুলো শুনতে পাইনা। পাইনা পরিচিত সেই ভেজা মাটির সোঁদাগন্ধ। বৃষ্টিভেজা লোডশেডিংয়ের রাতে আলো আধাঁরের খেলায় শুনা হয় না সুয়োরানী-দুয়োরানীর গল্প।

শনিবার, ১৫ জুন, ২০১৩

ফেবু স্ট্যাটাস #১

আমারা যে কেন এক সাথে থাকতে পারলাম না। বলেছিল এক সহোদর । আমরা এক এক জন, আলাদা আলাদা দ্বীপ। নিজের মতো করে সম্পন্ন মানুষ । কেন যে সামগ্রিক ভাবে সম্পন্ন হতে পারলাম না। বলে ছিল আরও একজন । বড়াইলের নীলিমার হাতছানিতে, বড়ম বাবার মেলা থেকে যারা এক সাথে কিনেছিলাম তালপাতার বাঁশি, সেই আমরা , পাহাড়, জঙ্গল , নদী , সাগর পেরিয়ে, ছিটকে পরেছি এখানে ওখানে। এই বিজ্ঞাপণী সময়ে, ফ্ল্যাট বাড়ির বেলকনিতে দাঁড়িয়ে, সম্পন্ন আমরা কী ভীষণ রকমের একা। উঁচু উঁচু দালান বাড়ির, ছোট ছোট ঘরে, প্রতি রাতে উঠে আসে আমাদের সম্মিলিত দিনের কোরাস । জিরি, চিরি, বরাক, সুরমার গ্রন্থনায় সে আমাদের নিজস্ব ভোর ।

শুক্রবার, ৭ জুন, ২০১৩

রাইনের মারিয়া রিলকের নবীন কবিকে লেখা চিঠি -২

ছায়া অনুবাদঃ দেবব্রত আচার্য

© ছবি

ভিয়ারগিয়ো, 
পিসার নিকটে ( ইতালি )
এপ্রিল ৫, ১৯০৩
  

   তোমার ২৪শে ফেব্রুয়ারি লিখা চিঠির উওর আজই দেয়া সম্ভব হচ্ছে । অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের জন্য ক্ষমা প্রার্থী । বেশ কিছুদিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপে কাবু হয়ে পড়েছি ।বলা যায় কার্যত আমাকে অচল করে দিয়েছে । শেষ পর্যন্ত দক্ষিণের সমুদ্র তটে হাওয়া বদলে এসে চেষ্টায় আছি শরীরটাকে একটু সুস্থ করার। আগেও এখানে একবার এসেছিলাম এমনি শরীর খারাপ নিয়ে। সেরেও উঠেছিলাম সে বার ।  এই অসুস্থতা হেতু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও  বড় করে চিঠি লিখা সম্ভব হবে না। লেখাটা এই মুহূর্তে বেশ কষ্টকর কাজ আমার জন্য।

      তোমার  চিঠি যেমনি আমাকে আমোদিত করে, তেমনি আমার উওর গুলো পড়তে পড়তে তুমিও নিশ্চয় হারিয়ে যাও । হয়ত বা তোমাকে কখন কখন সেগুলো নিরাশ করে। সত্যি বলতে কি জীবনের সবচেয়ে সুগভীর বিষয়গুলোতে আমরা সবাই ভীষণ রকমের একা। অনেক কিছু ঘটে যাওয়ার পর, অনেক পথ হেঁটে , সহস্র নক্ষত্র ঘটনার সাক্ষী হয়ে তবেই একজন মানুষ পারে অন্য এক মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে। সাহায্য করতে।

তোমাকে আজ  দুটি জিনিস বলতে চাই:

এক.  

       আয়রনী : একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে । তোমার সৃষ্টি সত্তা কে কখন এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে দিও না। বিশেষ করে যখন ভালো কিছু লিখতে পারছো না; তখন আয়রনী আশ্রয় নিতে যেওনা । অন্যদিকে যখন তুমি পুরো মাত্রায় সৃজনশীল , তখনই এটিকে ব্যাবহার করতে পারো  অন্য এক বাচনভঙ্গি হিসেবে। যদি বিশুদ্ধতার সাথে একে ব্যবহার করা যায় তবে আয়রনীও বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। এতে লজ্জার কিছু নেই। যদি এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার তোমাকে চিন্তিত করে তুলে তবে অন্য কোন মহৎ কিংবা সিরিয়াস বিষয়ে মনোনিবেশ করো। যাতে নূতন এই বিষয়ের সামনে আয়রনী কে নিতান্তই ছোট আর অসহায় মনে হয়। বস্তুর গভীরে গিয়ে খোঁজো । তারপর ও যদি তোমার লেখায় আয়রনী থেকে যায় তা হলে ধরে নিতে হবে তোমার জীবন কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্যসব মহৎ ও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কাজ করতে করতে হয়ত এটা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে ( যদি এটি  সাময়িক ভাবে এসে থাকে ) । আর যদি এটি তোমার ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার  সাথে একীভূত হয়ে থাকে তবে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে । শিল্প-সৃষ্টির নূতন এক হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হবে তোমার ঝুলিতে। 


দুই.

      চারপাশের হাজারো বইয়ের ভীরে, কটা বই আছে যাদের ছাড়া আমার চলে না । তার মধ্যে দুটি বই আমার সাথে সব সময়ই থাকে। যেখানেই যাই না কেন, বই দুটি আমার সঙ্গে যায়। এর একটি হল বাইবেল আর  অন্যটি ডেনিশ কবি জেন্স পিটার জ্যাকবসনের লিখা। তুমি উনার  লেখা পড়েছ ? জ্যাকবসনের  লেখাগুলো খুব সহজেই তুমি সংগ্রহ করে নিতে পারবে ।  রিক্লেমস ইউনিভার্সাল লাইব্রেরি তার বেশ কটি বইয়ের সাবলীল অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে । তার 'ছয়টি ছোটগল্প' এবং ‘নিলস লিহনি’ নামক উপন্যাসটি সংগ্রহ করে নাও । গল্পগ্রন্থের  প্রথম গল্প ‘ম্যাগনেস’ থেকে পড়া শুরু কর। গল্পটা পড়তে পড়তে তুমি হারিয়ে যাবে আশ্চর্য এক পৃথিবীতে। আনন্দময়ী এই  পৃথিবীর প্রাচুর্য আর বিশালতা তোমাকে ছুঁয়ে যাবে বার বার। কিছু সময় নিয়ে বইগুলো পড়।  যা কিছু শেখার বা আহরণ করার করে নাও। সব থেকে বড় কথা তুমি বইগুলো পড়ে আনন্দ পাবে।  তোমার জীবন যে পথেই যাক না কেন অনাগত দিনগুলোতে এই  নির্মল আনন্দ তোমার কাছে ফিরে ফিরে আসবে শতগুণে । বার  বার । এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত । এই পাঠ পরিক্রমা তোমার হাজারো  দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-বিষাদের,এই সব দিনরাত্রি থেকে অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ  ।

      যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমি এই অনন্ত নিঃসঙ্গ নির্মাণের দীক্ষা পেয়েছি কোথায় ? উত্তরে আমি দুটি মাত্র নাম বলব, একজন এই কবি জ্যাকবসন আর অন্যজন অগাস্টি র‌্যদাঁ, সেই অনন্য ভাস্কর, সমসাময়িক শিল্পীদের মাঝে যিনি প্রবাদ প্রতিম।

তোমার  এই পথচলা  সফল হোক।
                                                                    
তোমারই,                                                         
রাইনের মারিয়া রিলকে

পু ন র্মি ল ন 🍂

  দেখা হলো মুঠোফোনে! 'জীবন গিয়েছে কুড়ি-কুড়ি বছরের পার'! না তার থেকেও বেশী হবে? ফিরে ফিরে আসে কাঠালতলা-কুসুম ভোর, মনপড়ে বয়েস হোষ্ট...